বিশ সালের, এইচ.এস.সি.পরীক্ষার্থীদের ওপর, করোনার প্রভাবটা সবচেয়ে বেশিই । নাটকের সমস্ত নাটকীয়তা তাদের ঘিরে। ‘অটোপাশ’ নামক ট্যাগে, তাদের বিভিন্নভাবে ট্রল করা হচ্ছে। আমি জানি না, এটা শুনে তারা অভ্যস্ত হয়ে গ্যাছে, নাকি মানসিকভাবে বারবার আঘাত পাচ্ছে।
পরীক্ষার সময় সূচী নিয়ে, শেষ দৃশ্য ছিল অটো পাশ। তারপর ভেবেছিলাম, যাক, পরীক্ষা নিয়ে তো আর নাটক হবে না। এরপর শুরু হলো আরেক নাটকের অবতারণা, নাটকের নাম ‘গুচ্ছ না আলাদা’ খেলা শুরু হয়ে গেল। দর্শক তখন এইচ.এস.সি. পরীক্ষার্থী। একদল বলেন গুচ্ছ, আরেক দল বলেন আলাদা, কেউ বলেন গায়েবি পরীক্ষা নিবো, কেই বলেন উপস্থিতিতে পরীক্ষা নিব। এ সময়, মায়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের কথা খুব মনে পড়ছিল, পুশ ব্যাক আর পুশ ইনের কথা।
১৯৭৩ সালের যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে, যে চারটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় তার প্রত্যেকটির জন্য আলাদা আলাদা আইন তৈরি হয়, সেকারণে একটির সাথে অন্যটির কোন মিল নাই। বঙ্গবন্ধু চারটি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসিত করে দিলেন। তাঁদের আলাদা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দিলেন। বঙ্গবন্ধু সেই সব শিক্ষকদের জাতির বিবেক হিসেবে ঘোষণা দিলেন। আজ দেশে প্রায়, পঞ্চাশের অধিক বিশ্ববিদ্যালয়, এখন জাতির বিবেক পাড়ায়, মহল্লায়, ঘরে ঘরে দেখা যায়। উনাদের অনেকেই আবার বিজয় দিবসকে, স্বাধীনতা দিবস বলে প্রচার করেন, কেউ আবার জুতো পায়ে শহিদ মিনারে ফুল দেন, কেউ আবার ফুলের ডালায়, শ্রদ্ধাঞ্জলিকে শ্রদ্ধাঞ্জলী লিখেন, কেউ কেউ বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের পাতাকা বিকৃতি করেন, তারা যে স্বায়ত্তশাসিত তা সবক্ষেত্রেই প্রমাণ করেন!
সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার, দু’দিন পর পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি অপসারণের আন্দোলন হয়৷ কারণ হিসেবে জানা যায়, সীমাহীন দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি। লজ্জা আপনাদের নেই কিন্তু আমাদের আছে। আমরা আপনাদের কাছে পড়েছি।
আপনারা নাটক করুন, সিরিয়াল করুন, সিনেমা করুন, যাত্রা করুন, কারো কোন মাথা ব্যথা নেই, কিন্তু শিক্ষার্থী নিয়ে নাটক বন্ধ করুন। একটি সরল প্রশ্ন রেখে গেলাম, বিশ্ববিদ্যালয় কাদের জন্য?
দেশ, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসেও, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার স্থায়ী কোন পথ খুঁজে পেলেন না? প্রতি বছরই কেন
চেঞ্জ করতে হবে? প্রতি বছর পরীক্ষার জন্য আপনরা একটা করে নিয়ম প্রসব করেন, আর শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে, রাস্তা অবরোধ করে, পড়া বাদ দিয়ে স্লোগান দেই? কাদের জন্য নিয়ম বানান, আপনাদের জন্য না শিক্ষার্থীদের জন্য? শিক্ষার্থীদের জন্য বানালেতো তারা রাস্তায় দাঁড়াতো না। দেখুন, এই করোনার সময়ও আপনারা সময় মতো বেতন তুলেন, আপনারা দিব্যি ভালো আছেন, বউ-বাচ্চা নিয়ে সুখেই আছেন, শীত নিদ্রায় দুপুরকে ভোর বানাচ্ছেন। কিন্তু যারা শিক্ষার্থী, তাদের অবস্থা জানেন? স্কুল-কলেজের অধিকাংশ শিক্ষক ভালো পড়ান না, তাদের বিভিন্ন কোচিং বা প্রাইভেট এর সাহায্য নিতে হয়। বিশেষ করে গ্রামের ছেলে-মেয়েরা খুব কষ্টে হয়তো অল্প টাকায় একটা কোচিং এ ভর্তি হয়ে এডমিশন এর পড়া পড়ে আর ধনীর দুলালদের প্রতি বিষয়ে প্রাইভেট শিক্ষক থাকে। আর হুট করে বলে দিবেন, এ বিষয়ে পরীক্ষা হবে না ও বিষয়ে হবে। সাবজেক্ট বাড়াবেন-কমাবেন, সেটাতো স্থায়ী হওয়া লাগবে, কিন্তু প্রতি বছর পরিবর্তন কেন? আর এ ভোগান্তি এডমিশন পরীক্ষার্থীদের।
দেখুন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া একটা আবেগের নাম, একটা গৌরবের নাম, একটা ঐতিহ্যের নাম, কিছু মানুষের সামষ্টিক স্বপ্নের নাম, বাবা-মায়ের লালিত, লুকাইত অহংবোধের নাম। হুটহাট সিদ্ধান্ত নিবেন না, বড় কোন শিক্ষার্থীর দল বঞ্চিত হলো কী না খেয়াল করুন। বিভাগ পরিবর্তনের সুযোগ তুলে দেওয়াতে কতো হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলো সেই খোঁজটা রাখুন। আপনি বিভাগ পরিবর্তনের সুযোগ নাও রাখতে পারেন, কিন্ত সেটাতো এক বছর আগেই ঘোষণা দিন, যাতে মাঝপথে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আগের নিয়মতো আপনারাই করেছিলেন, তাহলে সেই নিয়মের জন্য যারা এখন ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের দায় আপনারা নিবেন না?
পরিশেষে, সেই সব মহান শিক্ষকদের স্মরণ করছি, যাঁরা সব কিছুর ঊর্ধ্বে থাকেন, যাঁরা এই অসুস্থ সময়ে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। প্রিয় স্যার, আপনারা জোহা স্যারের উত্তরসূরী, আপনাদের সেভাবেই দেখতে ভালো লাগে, আপনারা এগিয়ে আসুন।

2 Comments

Write A Comment